1. mahbub@krishinews24bd.com : krishinews :

মৎস্যচাষি পুনর্বাসনে জরুরি পদক্ষেপ দরকার

  • আপডেট টাইম : Monday, August 24, 2020
  • 184 Views
মৎস্যচাষি পুনর্বাসনে জরুরি পদক্ষেপ দরকার
মৎস্যচাষি পুনর্বাসনে জরুরি পদক্ষেপ দরকার

অনলাইন ডেস্ক
স্মরণাতীতকাল থেকে বাংলাদেশের প্রকৃতি, জলবায়ু, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস মাছের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাঙালির জীবন-জীবিকার একটি বড় অংশজুড়ে আছে মৎস্য আহরণ ও মৎস্যকেন্দ্রিক কর্মকান্ড। এজন্যই প্রবহমান নদী ও খাল-বিলের পাশে গড়ে উঠে অসংখ্য জেলেপল্লী। বর্ষাকালে বাংলাদেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা পানিতে থই থই করে। মাছ ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে পোনা হয়। মুক্ত জলাশয়ে বিচরণ করে পোনাগুলো পরিণত হয় বড় মাছে। মাছ উৎপাদনের জন্য এ রকম উপযুক্ত পরিবেশ পৃথিবীতে সত্যই বিরল।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। মিঠাপানির মাছ উৎপাদণে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ। বর্তমান সরকারের মৎস্যবান্ধব নীতিমালা, মৎস্যচাষীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং মৎস্যবিজ্ঞানীদের অধিক উৎপাদনশীল মাছের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কারণে এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে। উন্মুক্ত জলাশয়ে পোনামাছ অবমুক্তকরণ, মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন, মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং চাষি পর্যায়ে লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তরমূলক কর্মকান্ড বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।

বর্তমানে দেশে মাথাপিছু দৈনিক মাছের চাহিদা ৬০ গ্রাম। প্রতিদিন আমরা মাছ গ্রহণ করছি ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম। দেশের মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২৫ দশমিক ৭২ শতাংশ অবদান মৎস্য খাতের। বিগত ৫ বছরে মৎস্য খাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের অধিক মানুষ মৎস্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।

সরকারের মৎস্যবান্ধব কার্যক্রম এবং চাষি পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক লাগসই কারিগরি পরিসেবা প্রদানের ফলে ২০১৮-১৯ সালে দেশে মৎস্য উৎপাদন হয়েছে ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টন। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪২ লাখ ৭৪ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৮ হাজার টন, যা চাহিদার চেয়ে ৪৩ হাজার টন বেশি। বিগত ১২ বছরে মৎস্য খাতে গড় উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক শূন্য এক শতাংশ। উৎপাদনের এধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫ লাখ ৫২ হাজার টন।

দানা শস্য, শাকসবজি ও ফলমূল আবাদের চেয়ে মৎস্য চাষ অধিক লাভজনক হওয়ায় দেশের উদ্যোমী শিক্ষিত যুবকদের একটি বড় অংশ গতানুগতিক কৃষির পরিবর্তে মৎস্য চাষকেই বেছে নিয়েছে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন ও স্বাবলম্বী হওয়ার উপযুক্ত উপায় হিসেবে। দেশের বিভিন্ন জেলা বিশেষ করে ময়মনসিংহ, নাটোর, বগুড়া, নওগাঁ, যশোর, রংপুর ও দিনাজপুরে অসংখ্য যুবক মৎস্য চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। কেউ করছেন রেণু পোনা উৎপাদন। কেউ করছেন পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, থাই কৈ, সিলভার, রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছের চাষ। কেউ করছেন পাবদা, গোলসা, শিং, মাগুর, বাটা মাছের চাষ। আবার কেউ কেউ করছেন মাছের খাবার বিক্রির ব্যবসা। চালের কুড়া, সরিষার খৈল ও শুঁটকি কত কী? দেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মৎস্যচাষিদের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে দেশের প্রায় পোনে দুই কোটি লোক তাদের জীবন-জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য উপখাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ নারী, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ। এ ছাড়া বিগত ৫ বছরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত বার্ষিক ৬ লক্ষাধিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে মৎস্য খাত। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলোতে নিয়োজিত শ্রমিকের ৮০ শতাংশের অধিক নারী।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রুই জাতীয় মাছের পাশাপাশি পাঙ্গাশ, কৈ, শিং, পাবদা, সিলভার কার্প, কার্ফু ও তেলাপিয়া মাছের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছ। বিগত ৬ বছরে উন্মুক্ত জলাশয়ে পোনামাছ অবমুক্তকরণ এবং বিল নার্সারি স্থাপন করার ফলে দেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে বার্ষিক প্রায় ২ হাজার ৫৭৫ টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদিত হয়েছে। কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু মৎস্য অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, মেরামত এবং উন্নয়ন প্রকল্প হতে কয়েকটি অভয়াশ্রম স্থাপন ও রেক্ষণাবেক্ষণের ফলে বিলুপ্তপ্রায় এবং বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির মাছের পুনরাবির্ভাব ও প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। হালদা নদীর অভয়াশ্রম রক্ষায় নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে হালদায় এ বছর ২৫ হাজার ৭৭১ কেজি ডিম পাওয়া গেছে, যা বিগত ১২ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

পৃথিবীতে ইলিশ উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে মোট উৎপাদিত মাছের শতকরা ১২ ভাগ আসে ইলিশ থেকে। দেশের জিডিপিতে ইলিশের অবদান এক শতাংশের বেশি। জাটকা সংরক্ষণ ও প্রজনন সময়ে মা ইলিশ আহরণ বন্ধ এবং জেলেদের খাদ্য সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকান্ডের ফলে গত ১০ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় শতকরা ৭৮ ভাগ। বর্তমানে দেশে বার্ষিক ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন।

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ প্রাণিজ আমিষের জোগান দেয় মাছ। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পরও বাংলাদেশ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭০ হাজার ৯৪৫ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করে ৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, যা রফতানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক পর্যায়ে লকডাউন ও যানবাহন বন্ধ থাকার কারণে পানির দামে মাছ বিক্রি করে অনেক মৎস্যচাষি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। ওই সময় বাজার ব্যবস্থা সচল রাখতে মৎস্য অধিদফতর স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ মাছ বিক্রয় কেন্দ্র ও গ্রোথ সেন্টারের মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার টন মাছ বিক্রি করে, যার বাজারমূল্য ৫৬৫ কোটি টাকা। এতে কিছুটা হলেও মৎস্যচাষিরা লাভবান হন।

মৎস্য গবেষকদের মতে, সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিলুপ্ত হওয়ার পথযাত্রী প্রায় ২৩ প্রজাতির মাছকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এগুলো হলোÑ পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, শিং, মাগুর, আইড়, চিতল, ফলি, মহাশোল, বৈরালি, রাজপুঁটি, মেনি, গুতুম, গজার, কুঁচিয়া, ভাগনা, খলিশা, বাটা, দেশি সরপুঁটি, কালিবাউশ, কই, গজার ও গনিয়া। প্রায় বিলুপ্ত অবস্থা থেকে প্রাকৃতিক পর্যায়ে ফিরে আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে হাওর এলাকা এবং মেঘনা নদীর অববাহিকা। ওইসব এলাকায় রিটা, আইড়, বাগাইড়, নদীর পাঙ্গাশ, শিলন, চিতল এবং সরপুঁটি মাছের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আজ থেকে ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে ময়মনসিংহ, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলার ধানখেতে দেশীর প্রজাতির কত সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেত। পুঁটি, ট্যাংরা, শিং, মাগুর, টাকি, তারা বাইন, গুতুম, মলা, চান্দা, চেলা, বেলে ইত্যাদি। সে সময় ভাদ্র মাসে মেঘ ডাকলে খেলার মাঠ ও গ্রামের কাঁচা রাস্তায় কই মাছ উজিয়ে আসত। এখন এসব কথা জাদুর মতো মনে হয়। ধানখেতে নির্বিচারে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করে আমরা দেশীয় মাছের উর্বর প্রজনন ক্ষেত্রকে ধ্বংস করেছি। ধ্বংস করেছি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে ফসলের মাঠে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে। দেশের নদী-নালা, খাল-বিল দখল, দূষণ ও ভরাট বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে প্রাকৃতিক জলাশয়ে শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্য ফেলার মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ।

অল্প সময়ে অধিক উৎপাদনের কারণে ময়মনসিংহ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে পাঙ্গাশ মাছের চাষ হয় বেশি। অন্য মাছের তুলনায় দাম কম থাকায় স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে পাঙ্গাশ অতি প্রিয় মাছ। পোশাক কর্মী, রিকশা-ভ্যানচালকসহ বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত লোকজন মাছটির বড় ক্রেতা। করোনার কারণে এই শ্রেণির মানুষের আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় কমে গেছে পাঙ্গাশ মাছের দাম। বর্তমানে পুকুর থেকে পাঙ্গাশ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮২ টাকা কেজি দামে। গত বছর এ সময় প্রতি কেজি পাঙ্গাশ বিক্রি হয়েছিল ১০৫ থেকে ১১০ টাকা দামে। রাধা রমন মোদক ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মধুর বাহেরা গ্রামের একজন মৎস্যচাষি। প্রতি বছর তিনি সোয়া দুই একর জমিতে পাঙ্গাশসহ রুই, কাতলা, মৃগেল, মাগুর ও তেলাপিয়া মাছের চাষ করেন। গত বছর ২.২৫ একর জমি থেকে তিনি মাছ বিক্রি করে আয় করেন ১৩ লাখ টাকা। খরচ হয় ১১ লাখ টাকা। খরচ বাদে নিট লাভ হয় দুই লাখ টাকা। এ বছর মাছের দাম কম থাকায় ওই পুকুর থেকে খরচ বাদে এক লাখ টাকা লাভ হবে কি নাÑ এ ব্যাপারে তিনি সন্দিহান। করোনার কারণে রাধা রমন মোদকের মতো দেশের অসংখ্য মৎস্যচাষি প্রত্যাশিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হবেন। এ ছাড়া আম্পানের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক চিংড়িচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অধিদফতরের হিসাবমতে, চলমান বন্যাতেই ৩৮২ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষির সংখ্যা ৪৭ হাজার ৬৬২ জন।

মাছচাষিদের এ বিপদের সময়ে মৎস্য অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্তকর্তাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সাহস জোগাতে হবে। করোনা, আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষিদের প্রকৃত তালিকা তৈরি করে তাদের বিনামূল্যে মাছের পোনা প্রদান ও নগদ সহায়তা দিতে হবে এবং নতুন করে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রদান করতে হবে উন্নত পদ্ধতিতে মাছ চাষের লাগসই প্রযুক্তি, যাতে মৎস্যচাষিরা আবার নতুন উৎসাহে মাছ উৎপাদন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেন। এজন্য মৎস্যচাষি পুনর্বাসনে প্রয়োজন জরুরি পদক্ষেপ।

লেখক :নিতাই চন্দ্র রায়, সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লিমিটেড , netairoy18@yahoo.com

সুত্রঃ প্রতিদিনের সংবাদ

নিউজ টি শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ করে দিন...

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2020 krishinews24bd

Site Customized By NewsTech.Com